রাজনীতি কি কেবলই আদর্শের লড়াই, নাকি রক্ত আর উত্তরাধিকারের এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন? বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায় এমন কিছু প্রভাবশালী পরিবারের গল্প, যেখানে ক্ষমতা প্রবাহিত হয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। কোনো দেশে পিতা-মাতার সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে সন্তান গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব, আবার কোথাও স্বামী-স্ত্রীর হাত ধরে সূচিত হয়েছে এক অনন্য রাজনৈতিক ধারা। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে শুরু করে সুদূর কানাডা কিংবা গ্রিসের রাজনীতিতে এই বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। আজকের ফিচারে আমরা তুলে ধরব বিশ্বের এমন কিছু আলোচিত রাষ্ট্রনায়কের গল্প। ইন্টারনেট থেকে তথ্য নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন –আজহারুল ইসলাম অভি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়া পরিবার অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি পরিবার। এই পরিবারের প্রধান মেজর জিয়াউর রহমান এবং তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে আসীন হয়েছেন এবং বর্তমানে ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে তাদের জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানও দেশের নেতৃত্বে এসেছেন। নিচে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান : জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার বাগবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি করাচির ডিজে কলেজে পড়াশোনা শেষে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে তিনি কমিশন লাভ করেন। একজন সুদক্ষ সামরিক অফিসার হিসেবে তিনি ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের অষ্টম রাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের প্রধান ছিলেন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। পরে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তার শাসনামলে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন এবং অর্থনীতির মুক্তবাজারিকরণ শুরু হয়।
বেগম খালেদা জিয়া : বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী (বেনজির ভুট্টোর পর)। গৃহবধূ থেকে তার রাজপথের আপসহীন নেত্রী এবং পরবর্তীতে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যাত্রাটি অত্যন্ত ঘটনাবহুল। নিচে তার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ‘আপসহীন’ নেত্রী : আশির দশকে তৎকালীন সামরিক শাসক এইচএম এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া সাহসী ভূমিকা পালন করেন। এই সময়কালে তিনি বারবার গৃহবন্দি ও কারারুদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু এরশাদ সরকারের সঙ্গে কোনো আপস করেননি। তার এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি অভাবনীয় জয়লাভ করেন।
মৃত্যু ও রাজনৈতিক সমাপ্তি : ২০২৫ সালের শেষদিকে বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি ঢাকায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয় এবং বিএনপি তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীকে হারায়।
তারেক রহমান : বাবা-মায়ের উত্তরসূরি : তারেক রহমান ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় বগুড়া জেলা বিএনপির একজন সাধারণ সদস্য হিসেবে। তবে ২০০২ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। সে সময় তিনি তৃণমূল পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করার জন্য ‘তৃণমূল সম্মেলন’ এবং ‘বিভাগীয় প্রতিনিধি সভা’র মতো নতুন ধারার রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রবর্তন করেন।
ওয়ান-ইলেভেন ও নির্বাসিত জীবন : ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (১/১১) জরুরি অবস্থা জারির পর তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকাবস্থায় তার ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, যার ফলে তিনি গুরুতর মেরুদণ্ডের ইনজুরিতে আক্রান্ত হন। ২০০৮ সালে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান। এরপর দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি সপরিবারে লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে নির্বাসিত জীবন কাটান।
বিএনপির নেতৃত্ব ও লন্ডনে অবস্থান : বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ ও কারাবন্দি হওয়ার পর তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে লন্ডনে বসেই দলের হাল ধরেন। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনি প্রতিনিয়ত তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং আন্দোলন পরিচালনা করেন।
দেশে প্রত্যাবর্তন ও ২০২৬ সালের নির্বাচন : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারেক রহমানের দেশে ফেরার পথ প্রশস্ত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি বীরের বেশে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তার প্রত্যাবর্তন বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে তিনি বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণার মূল নেতৃত্বে ছিলেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলো জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
প্রধানমন্ত্রিত্বের পথে : নির্বাচনী ফলাফলে বিএনপির বিশাল বিজয়ের পর ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন। ধারণা করা হচ্ছে তিনি বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের ইতিহাসে সরকারপ্রধান হওয়ার গৌরব অর্জন করছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও একটি পরিবারও দুই প্রজন্মে ক্ষমতায় ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা- এই পিতা-কন্যার শাসনকাল দেশটির ইতিহাসের দীর্ঘ অধ্যায়। তাদের রাজনৈতিক যাত্রা ও শাসনকাল সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে আলোচনা করা হলো :
শেখ মুজিবুর রহমান : শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে আসেন। প্রথমে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিলেও সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। পরে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।শেখ হাসিনা : শেখ মুজিব নিহত হওয়ার দীর্ঘ সময় পর তার কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনেন। তিনি ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ২০০১ সাল পর্যন্ত ৫ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর ২০০৯ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। এর পর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি টানা ক্ষমতায় ছিলেন। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় ২০ বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার এক অভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে তিনি পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন।
সিঙ্গাপুর
সিঙ্গাপুরের ইতিহাসে লি কুয়ান ইউ এবং তার পুত্র লি সিয়েন লুং-এর ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের সম্মিলিত নেতৃত্ব সিঙ্গাপুরকে একটি অনুন্নত দ্বীপরাষ্ট্র থেকে বিশ্বের অন্যতম ধনী ও উন্নত দেশে রূপান্তরিত করেছে। নিচে তাদের শাসনকাল ও রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
লি কুয়ান ইউ : লি কুয়ান ইউ আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক হিসেবে পরিচিত। তিনি ১৯৫৯ সালের ৫ জুন সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। সে সময় সিঙ্গাপুর ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বায়ত্তশাসন লাভ করেছিল। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার সঙ্গে একীভূত হলেও ১৯৬৫ সালে তারা আলাদা হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। লি কুয়ান ইউ অত্যন্ত কঠোর হাতে এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি, শিক্ষা এবং অবকাঠামো গড়ে তোলেন। তিনি দীর্ঘ ৩১ বছর টানা ক্ষমতায় থাকার পর ১৯৯০ সালের ২৮ নভেম্বর স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করেন। তবে পদত্যাগের পরও তিনি ‘সিনিয়র মিনিস্টার’ এবং পরে ‘মিনিস্টার মেন্টর’ হিসেবে আমৃত্যু সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
লি সিয়েন লুং : লি কুয়ান ইউর জ্যেষ্ঠ পুত্র লি সিয়েন লুং তার বাবার সরাসরি উত্তরাধিকারী হিসেবে সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষমতায় বসেননি। লি কুয়ান ইউর পদত্যাগের পর সিঙ্গাপুরের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন গোহ চক টং। এর দীর্ঘ সময় পর, ২০০৪ সালের ১২ আগস্ট লি সিয়েন লুং সিঙ্গাপুরের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি তার বাবার প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক সাফল্যকে আরও বেগবান করেন এবং সিঙ্গাপুরকে বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রে পরিণত করেন। দীর্ঘ ২০ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার পর, তিনি ২০২৪ সালের ১৫ মে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লরেন্স অং-এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুরের মন্ত্রিসভায় ‘সিনিয়র মিনিস্টার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জাপানের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাকেয়ো ফুকুদা এবং ইয়াসুও ফুকুদা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জাপানের যুদ্ধোত্তর রাজনীতিতে বাবা ও ছেলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। নিচে তাদের রাজনৈতিক জীবন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হলো :
তাকেয়ো ফুকুদা : তাকেয়ো ফুকুদা ছিলেন জাপানের একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯৭৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর জাপানের ৬৭তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি জাপানের অর্থমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার শাসনামলে তিনি ‘ফুকুদা ডকট্রিন’ নামক একটি ঐতিহাসিক কূটনৈতিক নীতি ঘোষণা করেন, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে জাপানের সুসম্পর্ক স্থাপনে মাইলফলক হয়ে আছে। তিনি প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর ১৯৭৮ সালের ৭ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক সংস্কার জাপানের তৎকালীন সংকটময় মুহূর্তে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছিল।ইয়াসুও ফুকুদা, বাবার উত্তরসূরি : তাকেয়ো ফুকুদার পদত্যাগের দীর্ঘ ২৯ বছর পর তার পুত্র ইয়াসুও ফুকুদা জাপানের শীর্ষ পদে আসীন হন। ইয়াসুও ফুকুদা মূলত তার বাবার মতোই ধীরস্থির এবং ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতির জন্য পরিচিত ছিলেন। ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি জাপানের ৯১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে হঠাৎ পদত্যাগ করলে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (LDP) অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি ক্ষমতায় আসেন। এটি ছিল জাপানের ইতিহাসে প্রথম কোনো ঘটনা যেখানে বাবা ও ছেলে- উভয়েই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ইয়াসুও ফুকুদা সরাসরি তার বাবার হাত থেকে ক্ষমতা পাননি, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমা এবং সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এই পদে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি জাপানের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে ‘চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের রেকর্ড গড়েছিলেন। তবে তার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কাল খুব বেশি দীর্ঘ ছিল না। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা এবং জাপানের সংসদের উচ্চকক্ষে বিরোধীদের সঙ্গে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে তিনি মাত্র এক বছরের মাথায় ২০০৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন। যদিও তার শাসনকাল সংক্ষিপ্ত ছিল, জাপানের ইতিহাসে বাবা ও ছেলের এই অনন্য কীর্তি আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।
একনজরে শাসনকাল :
* তাকেয়ো ফুকুদা (বাবা) : ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৬-৭ ডিসেম্বর ১৯৭৮ (প্রায় ২ বছর)।
* ইয়াসুও ফুকুদা (ছেলে) : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৭-২৪ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (প্রায় ১ বছর)।
গ্রিসের রাজনৈতিক ইতিহাসে পাপানড্রেউ পরিবার একটি কিংবদন্তিতুল্য নাম। এই পরিবারের তিন প্রজন্ম- সিনিয়র জর্জিয়স, তার ছেলে আন্দ্রেয়াস এবং নাতি জর্জ- ভিন্ন ভিন্ন সময়ে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেছেন। নিচে তাদের শাসনকাল ও রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
জর্জিয়স পাপানড্রেউ : জর্জিয়স পাপানড্রেউ ছিলেন এই রাজনৈতিক বংশের মূল ভিত্তি। তিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনবার গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রথমবার তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৪ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত নির্বাসিত সরকারের এবং পরে মুক্ত গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৬৩ সালে স্বল্প সময়ের জন্য এবং সর্বশেষ ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৬৫ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাকে গ্রিসের রাজনীতিতে ‘গণতন্ত্রের বৃদ্ধ সেনাপতি’ বলা হতো। তার শাসনকাল ছিল গ্রিসের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাজতন্ত্রের সঙ্গে বিরোধের এক জটিল অধ্যায়।
আন্দ্রেয়াস পাপানড্রেউ ; জর্জিয়স পাপানড্রেউ-এর পুত্র আন্দ্রেয়াস পাপানড্রেউ গ্রিসের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী এবং জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। তিনি ‘পাসোক’ নামক সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করেন। তিনি প্রথমবার ১৯৮১ সালের ২১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং ১৯৮৯ সালের ২ জুলাই পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন। এরপর দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি ১৯৯৩ সালের ১৩ অক্টোবর পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন এবং অসুস্থতার কারণে ১৯৯৬ সালের ২২ জানুয়ারি পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার শাসনামলে গ্রিসে ব্যাপক সামাজিক সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে।
জর্জ পাপানড্রেউ : আন্দ্রেয়াস পাপানড্রেউ-এর পুত্র এবং জর্জিয়স পাপানড্রেউ-এর নাতি জর্জ পাপানড্রেউ (যিনি জর্জ পাপানড্রেউ জুনিয়র নামেও পরিচিত) পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারা বজায় রেখে গ্রিসের শীর্ষ পদে আসীন হন। তিনি ২০০৯ সালের ৬ অক্টোবর গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তবে তার শাসনামল ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, কারণ সে সময় গ্রিস ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে (Debt Crisis) নিমজ্জিত ছিল। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কঠোর শর্ত এবং দেশের অভ্যন্তরীণ গণবিক্ষোভের মুখে তিনি ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
একনজরে তিন প্রজন্মের শাসনকাল
জর্জিয়স পাপানড্রেউ (দাদা) : ১৯৪৪-১৯৪৫, ১৯৬৩ এবং ১৯৬৪-১৯৬৫ (বিভিন্ন মেয়াদে)।
আন্দ্রেয়াস পাপানড্রেউ (বাবা) : ১৯৮১-১৯৮৯ এবং ১৯৯৩-১৯৯৬ (মোট প্রায় ১১ বছর)।
জর্জ পাপানড্রেউ (সন্তান/নাতি) : ২০০৯-২০১১ (প্রায় ২ বছর)।
এই তিন নেতার হাত ধরে গ্রিস কয়েক দশক ধরে পরিচালিত হয়েছে, যা ইউরোপীয় রাজনীতিতে একটি বিরল ঘটনা।
কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাসে পিয়ের ট্রুডো এবং জাস্টিন ট্রুডো হলেন একমাত্র বাবা-ছেলে জুটি, যারা দেশটির প্রধানমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেছেন। তাদের হাত ধরেই কানাডার লিবারেল পার্টি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। নিচে তাদের শাসনকাল এবং ক্ষমতা লাভের প্রেক্ষাপট বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
পিয়ের ট্রুডো : পিয়ের ট্রুডো ছিলেন কানাডার ১৫তম প্রধানমন্ত্রী এবং দেশটির ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ও ক্যারিশম্যাটিক নেতা। তিনি প্রথমবার ১৯৬৮ সালের ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৯ সালের ৩ জুন পর্যন্ত টানা ক্ষমতায় থাকেন। স্বল্প বিরতির পর তিনি পুনরায় ১৯৮০ সালের ৩ মার্চ ক্ষমতায় ফিরে আসেন এবং ১৯৮৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পিয়ের ট্রুডোর দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে কানাডার সংবিধানে আমূল পরিবর্তন আসে এবং তিনি ‘কানাডিয়ান চার্টার অব রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস’ প্রবর্তনের মাধ্যমে দেশটির নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করেন। তার সময়েই কানাডা আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বিশেষ পরিচিতি পায়।
জাস্টিন ট্রুডো : পিয়ের ট্রুডোর জ্যেষ্ঠ পুত্র জাস্টিন ট্রুডো তার বাবার পদত্যাগের দীর্ঘ ৩১ বছর পর কানাডার শীর্ষ পদে আসীন হন। বাবার মৃত্যুর পর তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তিনি লিবারেল পার্টিকে পুনরুজ্জীবিত করেন। ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর জাস্টিন ট্রুডো কানাডার ২৩তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি কানাডার ইতিহাসে দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী। তার নেতৃত্বে লিবারেল পার্টি ২০১৫, ২০১৯ এবং ২০২১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে টানা ক্ষমতায় থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ, জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি এবং অভিবাসন নীতিতে তার সরকার বিশ্বব্যাপী আলোচিত। পরে ১৪ মার্চ ২০২৫ সালে তিনি তার ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
একনজরে বাবা ও ছেলের শাসনকাল
পিয়ের ট্রুডো (বাবা) : ১৯৬৮-১৯৭৯ এবং ১৯৮০-১৯৮৪ (মোট প্রায় ১৫ বছর)।
জাস্টিন ট্রুডো (ছেলে) : ৪ নভেম্বর ২০১৫ থেকে ১৪ মার্চ ২০২৫ (১০ বছরের বেশি সময়)।
একটি বিশেষ তথ্য : ১৯৭২ সালের ১৪ এপ্রিল ওটারাতে (কানাডার রাজধানী) একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ চলাকালের ঘটনা। সে সময় জাস্টিন ট্রুডোর বয়স ছিল মাত্র চার মাস। তখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মজা করে বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতের কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর স্বাস্থ্যের জন্য শুভকামনা।’ সেই ভবিষ্যদ্বাণী কয়েক দশক পর সত্যি হয়েছিল।
শ্রীলঙ্কার বন্দরনায়েকে পরিবার বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। এটি বিশ্বের একমাত্র পরিবার যেখানে স্বামী, স্ত্রী এবং সন্তান- তিনজনই আলাদা আলাদা সময়ে দেশটির সরকারপ্রধান (প্রধানমন্ত্রী) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নিচে তাদের শাসনকাল ও রাজনৈতিক জীবনের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো :
এসডব্লিউআরডি বন্দরনায়েকে : সলোমন ওয়েস্ট রিজেওয়ে ডায়াস (এসডব্লিউআরডি) বন্দরনায়েকে ছিলেন আধুনিক শ্রীলঙ্কার (তৎকালীন সিলন) অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। তিনি ১৯৫৬ সালে ‘শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি’ (SLFP) গঠন করেন এবং ১৯৫৬ সালের ১২ এপ্রিল দেশটির চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তার শাসনামলে শ্রীলঙ্কায় জাতীয়তাবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক সংস্কারের সূচনা হয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৫৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এক আততায়ীর গুলিতে তিনি নিহত হন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
সিরিমাভো বন্দরনায়েকে : তিনি ছিলেন বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। স্বামীর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকে রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং দলের হাল ধরেন। ১৯৬০ সালের ২১ জুলাই তিনি শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি মোট তিন মেয়াদে (১৯৬০-৬৫, ১৯৭০-৭৭ এবং ১৯৯৪-২০০০) প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তার শাসনামলেই ১৯৭২ সালে ‘সিলন’ নাম পরিবর্তন করে দেশটির নাম ‘শ্রীলঙ্কা’ রাখা হয় এবং এটি একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।
চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা : বন্দরনায়েকে দম্পতির কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে আরও উঁচুতে নিয়ে যান। তিনি ১৯৯৪ সালের ১৯ আগস্ট শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তবে ওই একই বছর তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করায় প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়ে শ্রীলঙ্কার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হন। মজার ব্যাপার হলো, তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তার মা সিরিমাভো বন্দরনায়েককে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যা ইতিহাসে মা ও মেয়ের একই সঙ্গে দেশ পরিচালনার এক বিরল দৃশ্য তৈরি করেছিল।
একনজরে বন্দরনায়েকে পরিবারের শাসনকাল
এসডব্লিউআরডি বন্দরনায়েকে (বাবা) : ১৯৫৬-১৯৫৯ (মৃত্যু পর্যন্ত)।
সিরিমাভো বন্দরনায়েকে (মা) : ১৯৬০-৬৫, ১৯৭০-৭৭ এবং ১৯৯৪-২০০০ (তিন মেয়াদে মোট প্রায় ১৮ বছর)।
চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা (সন্তান) : ১৯৯৪ (প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বল্পকাল) এবং ১৯৯৪-২০০৫ (প্রেসিডেন্ট হিসেবে)।
একটি বিশেষ তথ্য : ১৯৯৪ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন মেয়ে (চন্দ্রিকা) এবং সরকারপ্রধান ছিলেন মা (সিরিমাভো)। মা ও মেয়ের এই মেলবন্ধন বিশ্বরাজনীতিতে আজ অবধি অদ্বিতীয়।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভুট্টো (Bhutto) পরিবার সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং একই সঙ্গে ট্র্যাজিক এক নাম। এই পরিবারের বাবা এবং মেয়ে- উভয়েই দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দুজনেরই রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। নিচে তাদের শাসনকাল ও রাজনৈতিক জীবনের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো :
জুলফিকার আলী ভুট্টো : জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিলেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (PPP) প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিলেও, ১৯৭৩ সালে সংবিধান পরিবর্তনের পর দেশটির নবম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালের ১৪ আগস্ট থেকে ১৯৭৭ সালের ৫ জুলাই পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার শাসনামলে পাকিস্তানের বর্তমান সংবিধান প্রণীত হয় এবং তিনি দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির ভিত্তি স্থাপন করেন। তবে ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউল হকের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং পরবর্তীতে এক বিতর্কিত বিচার প্রক্রিয়ায় ১৯৭৯ সালের ৪ এপ্রিল তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
বেনজির ভুট্টো : তিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। জুলফিকার আলী ভুট্টোর জ্যেষ্ঠ কন্যা বেনজির ভুট্টো বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে ইতিহাস গড়েন। ১৯৮৮ সালের ২ ডিসেম্বর তিনি পাকিস্তানের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর মাধ্যমে তিনি কোনো মুসলিম প্রধান দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তার প্রথম মেয়াদ ছিল ১৯৯০ সালের আগস্ট পর্যন্ত। পরবর্তীতে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে ১৯৯৩ সালের ১৮ অক্টোবর পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন এবং ১৯৯৬ সালের ৫ নভেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন। তিনি মোট দুই মেয়াদে প্রায় ৫ বছর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ক্ষমতা লাভ ও ট্র্যাজিক সমাপ্তি : বেনজির ভুট্টো সরাসরি তার বাবার হাত থেকে ক্ষমতা পাননি; বরং বাবার মৃত্যুর প্রায় ৯ বছর পর গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন। তার রাজনৈতিক জীবন ছিল নির্বাসন, কারাবাস এবং সংগ্রামের গল্প। ২০০৭ সালে দীর্ঘ প্রবাসজীবন কাটিয়ে পাকিস্তানে ফিরে আসার পর নির্বাচনী প্রচারণার সময় ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডিতে এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় তিনি নিহত হন।
একনজরে বাবা ও মেয়ের শাসনকাল :
জুলফিকার আলী ভুট্টো (বাবা) : ১৪ আগস্ট ১৯৭৩-৫ জুলাই ১৯৭৭ (প্রায় ৪ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে)।
বেনজির ভুট্টো (মেয়ে) : ১৯৮৮-১৯৯০ এবং ১৯৯৩-১৯৯৬ (দুই মেয়াদে মোট প্রায় ৫ বছর)।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেহরু-গান্ধী পরিবার হলো সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজবংশ। এই পরিবারের তিন প্রজন্ম- পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী এবং নাতি রাজীব গান্ধী- ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেছেন। নিচে তাদের শাসনকাল ও রাজনৈতিক জীবনের নির্ভুল তথ্য দেওয়া হলো

রাজনীতি কি কেবলই আদর্শের লড়াই, নাকি রক্ত আর উত্তরাধিকারের এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন? বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায় এমন কিছু প্রভাবশালী পরিবারের গল্প, যেখানে ক্ষমতা প্রবাহিত হয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। কোনো দেশে পিতা-মাতার সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে সন্তান গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব, আবার কোথাও স্বামী-স্ত্রীর হাত ধরে সূচিত হয়েছে এক অনন্য রাজনৈতিক ধারা। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে শুরু করে সুদূর কানাডা কিংবা গ্রিসের রাজনীতিতে এই বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। আজকের ফিচারে আমরা তুলে ধরব বিশ্বের এমন কিছু আলোচিত রাষ্ট্রনায়কের গল্প। ইন্টারনেট থেকে তথ্য নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন –আজহারুল ইসলাম অভি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়া পরিবার অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি পরিবার। এই পরিবারের প্রধান মেজর জিয়াউর রহমান এবং তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে আসীন হয়েছেন এবং বর্তমানে ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে তাদের জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানও দেশের নেতৃত্বে এসেছেন। নিচে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান : জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার বাগবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি করাচির ডিজে কলেজে পড়াশোনা শেষে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে তিনি কমিশন লাভ করেন। একজন সুদক্ষ সামরিক অফিসার হিসেবে তিনি ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের অষ্টম রাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের প্রধান ছিলেন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। পরে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তার শাসনামলে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন এবং অর্থনীতির মুক্তবাজারিকরণ শুরু হয়।
বেগম খালেদা জিয়া : বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী (বেনজির ভুট্টোর পর)। গৃহবধূ থেকে তার রাজপথের আপসহীন নেত্রী এবং পরবর্তীতে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যাত্রাটি অত্যন্ত ঘটনাবহুল। নিচে তার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ‘আপসহীন’ নেত্রী : আশির দশকে তৎকালীন সামরিক শাসক এইচএম এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া সাহসী ভূমিকা পালন করেন। এই সময়কালে তিনি বারবার গৃহবন্দি ও কারারুদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু এরশাদ সরকারের সঙ্গে কোনো আপস করেননি। তার এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি অভাবনীয় জয়লাভ করেন।
মৃত্যু ও রাজনৈতিক সমাপ্তি : ২০২৫ সালের শেষদিকে বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি ঢাকায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয় এবং বিএনপি তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীকে হারায়।
তারেক রহমান : বাবা-মায়ের উত্তরসূরি : তারেক রহমান ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় বগুড়া জেলা বিএনপির একজন সাধারণ সদস্য হিসেবে। তবে ২০০২ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। সে সময় তিনি তৃণমূল পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করার জন্য ‘তৃণমূল সম্মেলন’ এবং ‘বিভাগীয় প্রতিনিধি সভা’র মতো নতুন ধারার রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রবর্তন করেন।
ওয়ান-ইলেভেন ও নির্বাসিত জীবন : ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (১/১১) জরুরি অবস্থা জারির পর তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকাবস্থায় তার ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, যার ফলে তিনি গুরুতর মেরুদণ্ডের ইনজুরিতে আক্রান্ত হন। ২০০৮ সালে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান। এরপর দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি সপরিবারে লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে নির্বাসিত জীবন কাটান।
বিএনপির নেতৃত্ব ও লন্ডনে অবস্থান : বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ ও কারাবন্দি হওয়ার পর তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে লন্ডনে বসেই দলের হাল ধরেন। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনি প্রতিনিয়ত তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং আন্দোলন পরিচালনা করেন।
দেশে প্রত্যাবর্তন ও ২০২৬ সালের নির্বাচন : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারেক রহমানের দেশে ফেরার পথ প্রশস্ত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি বীরের বেশে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তার প্রত্যাবর্তন বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে তিনি বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণার মূল নেতৃত্বে ছিলেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলো জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
প্রধানমন্ত্রিত্বের পথে : নির্বাচনী ফলাফলে বিএনপির বিশাল বিজয়ের পর ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন। ধারণা করা হচ্ছে তিনি বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের ইতিহাসে সরকারপ্রধান হওয়ার গৌরব অর্জন করছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও একটি পরিবারও দুই প্রজন্মে ক্ষমতায় ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা- এই পিতা-কন্যার শাসনকাল দেশটির ইতিহাসের দীর্ঘ অধ্যায়। তাদের রাজনৈতিক যাত্রা ও শাসনকাল সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে আলোচনা করা হলো :
শেখ মুজিবুর রহমান : শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে আসেন। প্রথমে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিলেও সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। পরে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
শেখ হাসিনা : শেখ মুজিব নিহত হওয়ার দীর্ঘ সময় পর তার কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনেন। তিনি ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ২০০১ সাল পর্যন্ত ৫ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর ২০০৯ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। এর পর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি টানা ক্ষমতায় ছিলেন। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় ২০ বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার এক অভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে তিনি পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন।
সিঙ্গাপুর
সিঙ্গাপুরের ইতিহাসে লি কুয়ান ইউ এবং তার পুত্র লি সিয়েন লুং-এর ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের সম্মিলিত নেতৃত্ব সিঙ্গাপুরকে একটি অনুন্নত দ্বীপরাষ্ট্র থেকে বিশ্বের অন্যতম ধনী ও উন্নত দেশে রূপান্তরিত করেছে। নিচে তাদের শাসনকাল ও রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
লি কুয়ান ইউ : লি কুয়ান ইউ আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক হিসেবে পরিচিত। তিনি ১৯৫৯ সালের ৫ জুন সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। সে সময় সিঙ্গাপুর ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বায়ত্তশাসন লাভ করেছিল। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার সঙ্গে একীভূত হলেও ১৯৬৫ সালে তারা আলাদা হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। লি কুয়ান ইউ অত্যন্ত কঠোর হাতে এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি, শিক্ষা এবং অবকাঠামো গড়ে তোলেন। তিনি দীর্ঘ ৩১ বছর টানা ক্ষমতায় থাকার পর ১৯৯০ সালের ২৮ নভেম্বর স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করেন। তবে পদত্যাগের পরও তিনি ‘সিনিয়র মিনিস্টার’ এবং পরে ‘মিনিস্টার মেন্টর’ হিসেবে আমৃত্যু সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
লি সিয়েন লুং : লি কুয়ান ইউর জ্যেষ্ঠ পুত্র লি সিয়েন লুং তার বাবার সরাসরি উত্তরাধিকারী হিসেবে সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষমতায় বসেননি। লি কুয়ান ইউর পদত্যাগের পর সিঙ্গাপুরের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন গোহ চক টং। এর দীর্ঘ সময় পর, ২০০৪ সালের ১২ আগস্ট লি সিয়েন লুং সিঙ্গাপুরের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি তার বাবার প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক সাফল্যকে আরও বেগবান করেন এবং সিঙ্গাপুরকে বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রে পরিণত করেন। দীর্ঘ ২০ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার পর, তিনি ২০২৪ সালের ১৫ মে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লরেন্স অং-এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুরের মন্ত্রিসভায় ‘সিনিয়র মিনিস্টার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জাপানের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাকেয়ো ফুকুদা এবং ইয়াসুও ফুকুদা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জাপানের যুদ্ধোত্তর রাজনীতিতে বাবা ও ছেলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। নিচে তাদের রাজনৈতিক জীবন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হলো :
তাকেয়ো ফুকুদা : তাকেয়ো ফুকুদা ছিলেন জাপানের একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯৭৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর জাপানের ৬৭তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি জাপানের অর্থমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার শাসনামলে তিনি ‘ফুকুদা ডকট্রিন’ নামক একটি ঐতিহাসিক কূটনৈতিক নীতি ঘোষণা করেন, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে জাপানের সুসম্পর্ক স্থাপনে মাইলফলক হয়ে আছে। তিনি প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর ১৯৭৮ সালের ৭ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক সংস্কার জাপানের তৎকালীন সংকটময় মুহূর্তে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছিল।
ইয়াসুও ফুকুদা, বাবার উত্তরসূরি : তাকেয়ো ফুকুদার পদত্যাগের দীর্ঘ ২৯ বছর পর তার পুত্র ইয়াসুও ফুকুদা জাপানের শীর্ষ পদে আসীন হন। ইয়াসুও ফুকুদা মূলত তার বাবার মতোই ধীরস্থির এবং ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতির জন্য পরিচিত ছিলেন। ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি জাপানের ৯১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে হঠাৎ পদত্যাগ করলে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (LDP) অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি ক্ষমতায় আসেন। এটি ছিল জাপানের ইতিহাসে প্রথম কোনো ঘটনা যেখানে বাবা ও ছেলে- উভয়েই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ইয়াসুও ফুকুদা সরাসরি তার বাবার হাত থেকে ক্ষমতা পাননি, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমা এবং সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এই পদে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি জাপানের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে ‘চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের রেকর্ড গড়েছিলেন। তবে তার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কাল খুব বেশি দীর্ঘ ছিল না। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা এবং জাপানের সংসদের উচ্চকক্ষে বিরোধীদের সঙ্গে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে তিনি মাত্র এক বছরের মাথায় ২০০৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন। যদিও তার শাসনকাল সংক্ষিপ্ত ছিল, জাপানের ইতিহাসে বাবা ও ছেলের এই অনন্য কীর্তি আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।
একনজরে শাসনকাল :
* তাকেয়ো ফুকুদা (বাবা) : ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৬-৭ ডিসেম্বর ১৯৭৮ (প্রায় ২ বছর)।
* ইয়াসুও ফুকুদা (ছেলে) : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৭-২৪ সেপ্টেম্বর ২০০৮ (প্রায় ১ বছর)।
গ্রিসের রাজনৈতিক ইতিহাসে পাপানড্রেউ পরিবার একটি কিংবদন্তিতুল্য নাম। এই পরিবারের তিন প্রজন্ম- সিনিয়র জর্জিয়স, তার ছেলে আন্দ্রেয়াস এবং নাতি জর্জ- ভিন্ন ভিন্ন সময়ে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেছেন। নিচে তাদের শাসনকাল ও রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
জর্জিয়স পাপানড্রেউ : জর্জিয়স পাপানড্রেউ ছিলেন এই রাজনৈতিক বংশের মূল ভিত্তি। তিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনবার গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রথমবার তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৪ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত নির্বাসিত সরকারের এবং পরে মুক্ত গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৬৩ সালে স্বল্প সময়ের জন্য এবং সর্বশেষ ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৬৫ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাকে গ্রিসের রাজনীতিতে ‘গণতন্ত্রের বৃদ্ধ সেনাপতি’ বলা হতো। তার শাসনকাল ছিল গ্রিসের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাজতন্ত্রের সঙ্গে বিরোধের এক জটিল অধ্যায়।
আন্দ্রেয়াস পাপানড্রেউ ; জর্জিয়স পাপানড্রেউ-এর পুত্র আন্দ্রেয়াস পাপানড্রেউ গ্রিসের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী এবং জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। তিনি ‘পাসোক’ নামক সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করেন। তিনি প্রথমবার ১৯৮১ সালের ২১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং ১৯৮৯ সালের ২ জুলাই পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন। এরপর দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি ১৯৯৩ সালের ১৩ অক্টোবর পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন এবং অসুস্থতার কারণে ১৯৯৬ সালের ২২ জানুয়ারি পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার শাসনামলে গ্রিসে ব্যাপক সামাজিক সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে।
জর্জ পাপানড্রেউ : আন্দ্রেয়াস পাপানড্রেউ-এর পুত্র এবং জর্জিয়স পাপানড্রেউ-এর নাতি জর্জ পাপানড্রেউ (যিনি জর্জ পাপানড্রেউ জুনিয়র নামেও পরিচিত) পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারা বজায় রেখে গ্রিসের শীর্ষ পদে আসীন হন। তিনি ২০০৯ সালের ৬ অক্টোবর গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তবে তার শাসনামল ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, কারণ সে সময় গ্রিস ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে (Debt Crisis) নিমজ্জিত ছিল। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কঠোর শর্ত এবং দেশের অভ্যন্তরীণ গণবিক্ষোভের মুখে তিনি ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
একনজরে তিন প্রজন্মের শাসনকাল
জর্জিয়স পাপানড্রেউ (দাদা) : ১৯৪৪-১৯৪৫, ১৯৬৩ এবং ১৯৬৪-১৯৬৫ (বিভিন্ন মেয়াদে)।
আন্দ্রেয়াস পাপানড্রেউ (বাবা) : ১৯৮১-১৯৮৯ এবং ১৯৯৩-১৯৯৬ (মোট প্রায় ১১ বছর)।
জর্জ পাপানড্রেউ (সন্তান/নাতি) : ২০০৯-২০১১ (প্রায় ২ বছর)।
এই তিন নেতার হাত ধরে গ্রিস কয়েক দশক ধরে পরিচালিত হয়েছে, যা ইউরোপীয় রাজনীতিতে একটি বিরল ঘটনা।
কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাসে পিয়ের ট্রুডো এবং জাস্টিন ট্রুডো হলেন একমাত্র বাবা-ছেলে জুটি, যারা দেশটির প্রধানমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেছেন। তাদের হাত ধরেই কানাডার লিবারেল পার্টি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। নিচে তাদের শাসনকাল এবং ক্ষমতা লাভের প্রেক্ষাপট বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
পিয়ের ট্রুডো : পিয়ের ট্রুডো ছিলেন কানাডার ১৫তম প্রধানমন্ত্রী এবং দেশটির ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ও ক্যারিশম্যাটিক নেতা। তিনি প্রথমবার ১৯৬৮ সালের ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৯ সালের ৩ জুন পর্যন্ত টানা ক্ষমতায় থাকেন। স্বল্প বিরতির পর তিনি পুনরায় ১৯৮০ সালের ৩ মার্চ ক্ষমতায় ফিরে আসেন এবং ১৯৮৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পিয়ের ট্রুডোর দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে কানাডার সংবিধানে আমূল পরিবর্তন আসে এবং তিনি ‘কানাডিয়ান চার্টার অব রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস’ প্রবর্তনের মাধ্যমে দেশটির নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করেন। তার সময়েই কানাডা আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বিশেষ পরিচিতি পায়।
জাস্টিন ট্রুডো : পিয়ের ট্রুডোর জ্যেষ্ঠ পুত্র জাস্টিন ট্রুডো তার বাবার পদত্যাগের দীর্ঘ ৩১ বছর পর কানাডার শীর্ষ পদে আসীন হন। বাবার মৃত্যুর পর তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তিনি লিবারেল পার্টিকে পুনরুজ্জীবিত করেন। ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর জাস্টিন ট্রুডো কানাডার ২৩তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি কানাডার ইতিহাসে দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী। তার নেতৃত্বে লিবারেল পার্টি ২০১৫, ২০১৯ এবং ২০২১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে টানা ক্ষমতায় থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ, জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি এবং অভিবাসন নীতিতে তার সরকার বিশ্বব্যাপী আলোচিত। পরে ১৪ মার্চ ২০২৫ সালে তিনি তার ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
একনজরে বাবা ও ছেলের শাসনকাল
পিয়ের ট্রুডো (বাবা) : ১৯৬৮-১৯৭৯ এবং ১৯৮০-১৯৮৪ (মোট প্রায় ১৫ বছর)।
জাস্টিন ট্রুডো (ছেলে) : ৪ নভেম্বর ২০১৫ থেকে ১৪ মার্চ ২০২৫ (১০ বছরের বেশি সময়)।
একটি বিশেষ তথ্য : ১৯৭২ সালের ১৪ এপ্রিল ওটারাতে (কানাডার রাজধানী) একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ চলাকালের ঘটনা। সে সময় জাস্টিন ট্রুডোর বয়স ছিল মাত্র চার মাস। তখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মজা করে বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতের কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর স্বাস্থ্যের জন্য শুভকামনা।’ সেই ভবিষ্যদ্বাণী কয়েক দশক পর সত্যি হয়েছিল।
শ্রীলঙ্কার বন্দরনায়েকে পরিবার বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। এটি বিশ্বের একমাত্র পরিবার যেখানে স্বামী, স্ত্রী এবং সন্তান- তিনজনই আলাদা আলাদা সময়ে দেশটির সরকারপ্রধান (প্রধানমন্ত্রী) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নিচে তাদের শাসনকাল ও রাজনৈতিক জীবনের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো :
এসডব্লিউআরডি বন্দরনায়েকে : সলোমন ওয়েস্ট রিজেওয়ে ডায়াস (এসডব্লিউআরডি) বন্দরনায়েকে ছিলেন আধুনিক শ্রীলঙ্কার (তৎকালীন সিলন) অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। তিনি ১৯৫৬ সালে ‘শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি’ (SLFP) গঠন করেন এবং ১৯৫৬ সালের ১২ এপ্রিল দেশটির চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তার শাসনামলে শ্রীলঙ্কায় জাতীয়তাবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক সংস্কারের সূচনা হয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৫৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এক আততায়ীর গুলিতে তিনি নিহত হন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
সিরিমাভো বন্দরনায়েকে : তিনি ছিলেন বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। স্বামীর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকে রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং দলের হাল ধরেন। ১৯৬০ সালের ২১ জুলাই তিনি শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি মোট তিন মেয়াদে (১৯৬০-৬৫, ১৯৭০-৭৭ এবং ১৯৯৪-২০০০) প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তার শাসনামলেই ১৯৭২ সালে ‘সিলন’ নাম পরিবর্তন করে দেশটির নাম ‘শ্রীলঙ্কা’ রাখা হয় এবং এটি একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।
চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা : বন্দরনায়েকে দম্পতির কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে আরও উঁচুতে নিয়ে যান। তিনি ১৯৯৪ সালের ১৯ আগস্ট শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তবে ওই একই বছর তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করায় প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়ে শ্রীলঙ্কার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হন। মজার ব্যাপার হলো, তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তার মা সিরিমাভো বন্দরনায়েককে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যা ইতিহাসে মা ও মেয়ের একই সঙ্গে দেশ পরিচালনার এক বিরল দৃশ্য তৈরি করেছিল।
একনজরে বন্দরনায়েকে পরিবারের শাসনকাল
এসডব্লিউআরডি বন্দরনায়েকে (বাবা) : ১৯৫৬-১৯৫৯ (মৃত্যু পর্যন্ত)।
সিরিমাভো বন্দরনায়েকে (মা) : ১৯৬০-৬৫, ১৯৭০-৭৭ এবং ১৯৯৪-২০০০ (তিন মেয়াদে মোট প্রায় ১৮ বছর)।
চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা (সন্তান) : ১৯৯৪ (প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বল্পকাল) এবং ১৯৯৪-২০০৫ (প্রেসিডেন্ট হিসেবে)।
একটি বিশেষ তথ্য : ১৯৯৪ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন মেয়ে (চন্দ্রিকা) এবং সরকারপ্রধান ছিলেন মা (সিরিমাভো)। মা ও মেয়ের এই মেলবন্ধন বিশ্বরাজনীতিতে আজ অবধি অদ্বিতীয়।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভুট্টো (Bhutto) পরিবার সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং একই সঙ্গে ট্র্যাজিক এক নাম। এই পরিবারের বাবা এবং মেয়ে- উভয়েই দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দুজনেরই রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। নিচে তাদের শাসনকাল ও রাজনৈতিক জীবনের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো :
জুলফিকার আলী ভুট্টো : জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিলেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (PPP) প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিলেও, ১৯৭৩ সালে সংবিধান পরিবর্তনের পর দেশটির নবম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালের ১৪ আগস্ট থেকে ১৯৭৭ সালের ৫ জুলাই পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার শাসনামলে পাকিস্তানের বর্তমান সংবিধান প্রণীত হয় এবং তিনি দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির ভিত্তি স্থাপন করেন। তবে ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউল হকের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং পরবর্তীতে এক বিতর্কিত বিচার প্রক্রিয়ায় ১৯৭৯ সালের ৪ এপ্রিল তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
বেনজির ভুট্টো : তিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। জুলফিকার আলী ভুট্টোর জ্যেষ্ঠ কন্যা বেনজির ভুট্টো বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে ইতিহাস গড়েন। ১৯৮৮ সালের ২ ডিসেম্বর তিনি পাকিস্তানের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর মাধ্যমে তিনি কোনো মুসলিম প্রধান দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তার প্রথম মেয়াদ ছিল ১৯৯০ সালের আগস্ট পর্যন্ত। পরবর্তীতে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে ১৯৯৩ সালের ১৮ অক্টোবর পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন এবং ১৯৯৬ সালের ৫ নভেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন। তিনি মোট দুই মেয়াদে প্রায় ৫ বছর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ক্ষমতা লাভ ও ট্র্যাজিক সমাপ্তি : বেনজির ভুট্টো সরাসরি তার বাবার হাত থেকে ক্ষমতা পাননি; বরং বাবার মৃত্যুর প্রায় ৯ বছর পর গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন। তার রাজনৈতিক জীবন ছিল নির্বাসন, কারাবাস এবং সংগ্রামের গল্প। ২০০৭ সালে দীর্ঘ প্রবাসজীবন কাটিয়ে পাকিস্তানে ফিরে আসার পর নির্বাচনী প্রচারণার সময় ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডিতে এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় তিনি নিহত হন।
একনজরে বাবা ও মেয়ের শাসনকাল :
জুলফিকার আলী ভুট্টো (বাবা) : ১৪ আগস্ট ১৯৭৩-৫ জুলাই ১৯৭৭ (প্রায় ৪ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে)।
বেনজির ভুট্টো (মেয়ে) : ১৯৮৮-১৯৯০ এবং ১৯৯৩-১৯৯৬ (দুই মেয়াদে মোট প্রায় ৫ বছর)।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেহরু-গান্ধী পরিবার হলো সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজবংশ। এই পরিবারের তিন প্রজন্ম- পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী এবং নাতি রাজীব গান্ধী- ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেছেন। নিচে তাদের শাসনকাল ও রাজনৈতিক জীবনের নির্ভুল তথ্য দেওয়া হলো :
জওহরলাল নেহরু : পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট শপথ গ্রহণ করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৬৪ সালের ২৭ মে পর্যন্ত টানা প্রায় ১৭ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি ভারতের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী। তার শাসনামলে ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং শিল্পায়নের ভিত্তি স্থাপিত হয়। তাকে আধুনিক ভারতের প্রধান রূপকার বলা হয়।
ইন্দিরা গান্ধী : তিনি ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। জওহরলাল নেহরুর একমাত্র কন্যা ইন্দিরা গান্ধী বাবার মৃত্যুর প্রায় দুই বছর পর দেশের হাল ধরেন। তিনি ১৯৬৬ সালের ২৪ জানুয়ারি ভারতের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার শপথ নেন এবং ১৯৭৭ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত একটানা দায়িত্ব পালন করেন। এর পরও তিনি আরও একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী হন। তবে দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর নিজ দেহরক্ষীদের গুলিতে তিনি নিহত হন। তিনি প্রায় ১৫ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
রাজীব গান্ধী : ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর ঠিক পরপরই তার জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর তিনি শপথ নেন এবং মাত্র ৪০ বছর বয়সে ভারতের কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার রেকর্ড গড়েন। তিনি ১৯৮৯ সালের ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন। তার শাসনামলে ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি এবং টেলিকমিউনিকেশন বিপ্লবের সূচনা হয়। তবে ১৯৯১ সালে একটি নির্বাচনী প্রচারণায় আত্মঘাতী বোমা হামলায় তিনিও প্রাণ হারান।
একনজরে নেহরু-গান্ধী পরিবারের শাসনকাল
জওহরলাল নেহরু (বাবা) : ১৯৪৭-১৯৬৪ (টানা প্রায় ১৭ বছর)।
ইন্দিরা গান্ধী (কন্যা) : ১৯৬৬-১৯৭৭ এবং ১৯৮০-১৯৮৪ (দুই মেয়াদে মোট প্রায় ১৫ বছর)
রাজীব গান্ধী (নাতি) : ১৯৮৪-১৯৮৯ (প্রায় ৫ বছর)।
একটি বিশেষ তথ্য : রাজীব গান্ধীর স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী ২০০৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভের পর প্রধানমন্ত্রীর হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ড. মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করেন। বর্তমানে তাদের পুত্র রাহুল গান্ধী ভারতের বিরোধীদলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।