জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে প্রশাসনকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য একটি জনমুখী প্রশাসন গড়ে তোলা, যেখানে সাধারণ মানুষ সরকারি দপ্তরে গিয়ে সম্মানের সঙ্গে দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সেবা পাবে।
বুধবার রাতে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন’র বার্ষিক সম্মিলন ২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। এময় তিনি জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের নির্ভয়ে এবং নিরপেক্ষভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ এবং জনগণের কল্যাণে আপনারা (ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনার) নির্ভয় নিরপেক্ষভাবে কাজ করুন। সরকার আপনাদের যেকোনো আইনগত এবং মানবিক উদ্যোগে সক্রিয় সহায়তা দেবে, ইনশাআল্লাহ।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগণের বিশ্বাস। সরকার এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে জনমনে এ বিশ্বাস কিন্তু ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। এ ব্যাপারেও আপনারা যত্নবান থাকবেন বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’
মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা, বিশেষ করে বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকরা হচ্ছেন মাঠ পর্যায়ে সরকারের প্রশাসনিক অ্যাম্বাসেডর।’
তারেক রহমান বলেন, ‘দেশ এবং জনগণের কল্যাণে আমরা দলীয়ভাবে যেসব ইশতেহার প্রণয়ন করেছিলাম, সেই ইশতেহারের পক্ষে দেশের জনগণ সমর্থন জানিয়েছে। সুতরাং, এটি এখন আর বিএনপির দলীয় ইশতেহার নয়। এটি এখন দেশের জনগণের ইশতেহার। এটি এখন জনগণের জন্য সরকারের ইশতেহার। সুতরাং, এখন ইশতেহার বাস্তবায়নের পালা।’
তিনি আরও বলেন, ‘জনস্বার্থে নেওয়া সরকারের কাজগুলো বাস্তবায়নের প্রধান দায়িত্ব জনপ্রশাসনের ওপর বর্তায়। সুতরাং, সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে জনপ্রশাসনের সাফল্য, শেষ পর্যন্ত সরকারের সাফল্য হয়ে দাঁড়ায়।’
জনগণের প্রত্যাশা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের ওপর জনগণের প্রত্যাশা অনেক। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের সব যৌক্তিক প্রত্যাশা সাধ্যমতো পূরণ করতে বদ্ধপরিকর। এটি জনগণের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার।’
সরকারি সেবার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন,‘আমরা কথায় কথায় বলি, জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। জনগণ যদি মালিক হয় তাহলে এই মালিক অর্থাৎ সেবাগ্রহীতারা যখন অফিস আদালতে তাদের সমস্যা নিয়ে যান, তারা যেন আপনাদের সেবায় কিছুটা হলেও রাষ্ট্রের মালিকানা অনুভব করতে পারেন- সেটি নিশ্চিত করা আপনাদের দায়িত্ব।’
একজন সাধারণ নাগরিকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন,‘ধরা যাক একজন সাধারণ নাগরিক কিংবা একজন দিনমজুর, তিনি যখন জন্মনিবন্ধন সনদ সংশোধন করার জন্য আপনাদের অফিসে যান, তিনি হয়তো জানেন না কোন টেবিলে যেতে হবে, কোন কর্মকর্তাকে কী বলতে হবে।’
তিনি বলেন,‘এমন পরিস্থিতিতে সেবাগ্রহীতা যদি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আন্তরিক ব্যবহার পান তাহলে এটি রাষ্ট্র এবং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা এবং বিশ্বাস বাড়ায়। আর যদি হয়রানির শিকার হন, তাহলে তিনি শুধু একটি সেবা থেকেই বঞ্চিত হলেন না। বরং, রাষ্ট্র এবং সরকারের প্রতি তার শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাস নষ্ট হয়।’
তিনি আরও বলেন,‘রাষ্ট্র এবং সরকারের সঙ্গে জনগণের জন-আস্থা তৈরির ক্ষেত্রে আপনাদের কার্যক্রম মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে হয়তো সবার সবকিছু সমাধান করে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু ভুক্তভোগীর মনে অন্তত এই ধারণা জন্মানো জরুরি যে, আপনি কিংবা আপনার অফিস তার সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে আন্তরিক।’
প্রশাসনকে জনমুখী করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন,‘প্রশাসনকে জনমুখী করে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের সরকার এমন একটি জনমুখী প্রশাসন চায় যেখানে সরকারি দপ্তরে সাধারণ মানুষ সম্মানের সঙ্গে দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সেবা পাবে। এ বিষয়টি আপনাদেরই নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আইন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, মানবিকতা আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।’
বয়স্ক ও অসুস্থ নাগরিকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একজন বৃদ্ধ কিংবা অসুস্থ মানুষ আপনাদের অফিসে আসেন কিংবা সেবার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন তাদের বিষয়গুলো আইনগত উপায়ে সমাধানের পাশাপাশি তাদের প্রতি মানবিক আচরণও জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেবাগ্রহীতার প্রতি আপনাদের আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল ব্যবহার, তাদের প্রতি রাষ্ট্র এবং সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণার জন্ম দেয়। হয়তো এই বিষয়গুলো ছোট, কিন্তু জনমনে এর প্রভাব অনেক বেশি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগণের বিশ্বাস। সরকার এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে জনমনে এই বিশ্বাস গড়ে উঠে। আমাদের মনে রাখা দরকার, প্রশাসন শুধু আইন প্রয়োগের যন্ত্র নয়, এটি মানুষের সেবার একটি মাধ্যম।’
দেশের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সমস্যা অসংখ্য, তবে সম্ভাবনাও কম নয়। আমাদের দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের সুযোগ নিয়ে আমরা যদি তরুণ এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি, তাহলে এই জনসংখ্যাই হবে আমাদের জনসম্পদ। এরাই বদলে দিতে পারবে আমাদের বাংলাদেশ।’
ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রসঙ্গে তিনি বলেন,‘যথাসম্ভব মানুষের উপকার করার মানসিকতা থাকতে হবে। রাষ্ট্র এবং সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধগুলোকে জাগিয়ে রাখতে আমাদেরকে সম্ভাব্য সব উপায় বের করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হতে হবে। একটি রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র ইউনিট একটি পরিবার। একইভাবে অনেকগুলো পরিবারের সম্মিলনই হলো আমাদের রাষ্ট্র।’
সবশেষে তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘দেশ এবং জনগণের কল্যাণে আপনারা নির্ভয়ে নিরপেক্ষভাবে কাজ করুন। সরকার আপনাদের যে কোনো আইনগত এবং মানবিক উদ্যোগে সক্রিয় সহায়তা দেবে।’বিডি প্রতিদিন/এম.এস